Connect with us

Tech

সাম্প্রতিক ইতিহাসের ভয়াবহ বন্যা, বন্যা ২০২২

Published

on

Flood-2022

ডেস্ক রিপোর্ট:
গত ১১ মে থেকে অব্যাহত ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সিলেট জেলায় বন্যা শুরু হয়। জেলার অভ্যন্তর দিয়ে প্রবাহিত সুরমা নদী, সারি নদী, লুভা নদী, ধলাই নদী, কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পায় এবং প্রতিটি পয়েন্টই বিপৎসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। উজানের পানি নামতে থাকায় নতুন করে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে থাকে। ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বভাগের অঞ্চলগুলিতে প্রবল বন্যার কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যু ঘটে।

জুন মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর, চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগের ১৭টিরও বেশি জেলায় বন্যার প্রভাব পড়ে। এরমধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয় সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা। বন্যার প্রভাবে সবমিলিয়ে অর্ধ কোটিরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়। বন্যায় কেবল সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় শতকরা যথাক্রমে ৮০ ও ৯০ ভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে পানিবন্দি হয়ে পড়ে বিশাল জনপদ। বিদ্যুৎসংযোগ বন্ধ হয়ে যায়, দেশের অনান্য অঞ্চলের সাথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন পড়ে। দেশের ইতিহাসের ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যার পরে এটিকে অঞ্চলগুলির সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক বন্যা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। বেসামরিক প্রশাসন বন্যা পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড বাহিনী মোতায়েন, সিলেটের আন্তর্জাতিক ওসমানী বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ আরোহণ-অবতরণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় জুন মাসের শেষের দিক পর্যন্ত হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, টাঙ্গাইলসহ আরও বেশ কিছু জেলা বন্যায় আক্রান্ত হয়। ফলে বন্যায় আক্রান্ত এলাকাগুলোতে ক্ষতিগ্রস্থ হয় হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি, ক্ষেত-খামার, মাছের ঘের, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য মতে ১৭ জুন থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত বন্যাকবলিত এলাকায় মৃত্যু হয় ৬৮ জনের। বন্যার কারণে বিভিন্ন এলাকায় ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

বন্যার কারণ:
বাংলাদেশে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছে তার সম্ভাব্য কারণ জলবায়ু পরিবর্তন বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনও (বাপা) মনে করে জলবায়ু পরিবর্তন, পানি-পলি ব্যবস্থাপনা ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বেষ্টনীর কারণে দেশে এ ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে।

২০২২-এর জুন মাসে মাত্র তিন দিনে ভারতের আসাম ও মেঘালয় অঙ্গরাজ্যে আড়াই হাজার মিলিমিটারের মতো বৃষ্টিপাত হয়, যা গত ২৭ বছরে তিন দিনে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। এক পর্যায়ে বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে (বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে) ২৪ ঘণ্টায় ৯৭২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যা বিগত ১২২ বছরের মধ্যে এক দিনে তৃতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট আসাম ও মেঘালয়ের ঢলের পানি ভারতের বরাক নদী হয়ে সিলেট অঞ্চলের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীসহ বহুসংখ্যক উপনদী ও হাওর অঞ্চল হয়ে ধনু নদীর মাধ্যমে কিশোরগঞ্জে মেঘনা নদীতে গিয়ে মেশে।

হাওরগুলিতে অপরিকল্পিতভাবে সড়ক, স্লুইসগেট ও বাঁধ নির্মাণ, নদীশাসন ও উন্নয়নের নামে নদীর গতিপথ সংকোচন, নদীতে বর্জ্য ফেলা, নদীদখল, উজানে নির্বিচারে পাহাড় ও টিলা কাটার ফলে ভূমিক্ষয়ের কারণে পলি জমা হয়ে বাংলাদেশের নদীসমূহের নাব্যতা হ্রাস, ভারতে উজানে বাঁধ নির্মাণ ও বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি আকস্মিক ছেড়ে দেওয়া, ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি সাম্প্রতিককালে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে হাওড় অঞ্চলটি সমুদ্র সমতল থেকে খুব বেশি উঁচু নয় বলে সহজেই প্লাবিত হয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলেন, যে প্রবল বৃষ্টিপাত বাংলাদেশে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছে তার সম্ভাব্য কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমী বৃষ্টিপাত যদিও প্রাকৃতিক বায়ুমণ্ডলীয় প্যাটার্ন অনুসরণ করে, তবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় এটি আরও অনিশ্চিত ও প্রবল হয়ে উঠছে। (রয়টার্স)

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপা মনে করে তিনটি কারণে বাংলাদেশে এই ভয়াবহ বন্যার দেখা দিয়েছে। প্রথম কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা এ আন্দোলনটি। এটা বৈশ্বিক কারণ। এই বৃষ্টি আরও বাড়বে।

দ্বিতীয় কারণ, ভারতের আওতায় অনেক নদী আছে। মেঘনা অববাহিকায় ১৬টি আন্তদেশীয় নদী আছে। কিন্তু একটির জন্যও পানি-পলি ব্যবস্থাপনা যৌথভাবে করার চুক্তি নেই। ভারত তাদের বাধ ইচ্ছেমতো ব্যবহার করছে। যখন প্রয়োজন পানি ধরে রেখেছে। যখন প্রয়োজন খুলে দিয়েছে। যৌথ ব্যবস্থাপনায় গেলে পরিস্থিতি সামলানো যেত। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বেষ্টনী পদ্ধতির ব্যবহার, ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, নদী দখল ও ব্যবস্থাপনার অনিয়ম, যত্রতত্র বালু উত্তোলনকে বন্যার তৃতীয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে বাপা।

বন্যার্তদের সাহায্য:
বন্যায় দেশের ১১টি জেলায় মানবিক সহায়তা হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকদের অনুকূলে ১৭২০ মেট্রিক টন চাল, দুই কোটি ৭৬ লাখ টাকা নগদ সহায়তা ও ৫৮ হাজার শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ দেওয়া জেলাগুলোর মধ্যে- সিলেট জেলায় এক হাজার মেট্রিক টন চাল, এক কোটি ১৩ লাখ টাকা ও ২০ হাজার শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট, সুনামগঞ্জ জেলায় ৫২০ মেট্রিক টন চাল, ৯৮ লাখ টাকা ও ১২ হাজার শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট, নেত্রকোনা জেলায় একশত মেট্রিক টন চাল, ২০ লাখ টাকা ও ৫ হাজার শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট, রংপুর জেলায় তিন হাজার শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট, নীলফামারী জেলায় ৫ লাখ টাকা ও ৩ হাজার শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট, কুড়িগ্রাম জেলায় ১০ লাখ টাকা ও এক হাজার শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট, হবিগঞ্জ জেলায় ১০ লাখ টাকা ও ২ হাজার শুকনো অন্যান্য খাবারের প্যাকেট, মৌলভীবাজার জেলায় একশত মেট্রিক টন চাল, ১০ লাখ টাকা ও ২ হাজার শুকনো অন্যান্য খাবারের প্যাকেট । শেরপুর জেলায় ১০ লাখ টাকা ও ৪ হাজার শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট, জামালপুর জেলায় ৪ হাজার শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট এবং কিশোরগঞ্জ জেলায় ২ হাজার শুকনো অন্যান্য খাবারের প্যাকেট দেওয়া হয়। এছাড়াও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, আগামীতে যা যা বরাদ্দ প্রয়োজন তা প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে।

শুরু থেকেই বন্যা পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন। সরকারি ও আওয়ামী লীগের দলীয় উদ্যোগে বন্যার্তদের জন্য সরকারের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক এবং উপকমিটির সদস্য সচিব সুজিত রায় নন্দী জানান, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বন্যার্তদের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছে সরকার ও আওয়ামী লীগ। এছাড়াও দলটির অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরাও মাঠে রয়েছেন।

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যা কবলিত এলাকা এবং বন্যার্ত মানুষের দুর্দশা সরেজমিন দেখতে ২১ জুন সিলেটে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হেলিকপ্টার থেকে প্রথমে নেত্রকোণা, তারপর সুনামগঞ্জ এবং সবশেষে সিলেটের পরিস্থিতি তিনি দেখেন। বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন শেষে সকাল ১০টার কিছুক্ষণ আগে প্রধানমন্ত্রী সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী বিমানবন্দর থেকে সিলেট সার্কিট হাউজে গিয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় প্রশাসনকে বন্যা মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করেন।

দেশে বন্যার্তদের ত্রাণের অর্থ সংগ্রহে জনগণের কাছ থেকে অর্থ সহযোগিতার উদ্যোগ নেয় বিএনপি। ২৩ জুন থেকে রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে এই কার্যক্রম শুরু করে তারা। এছাড়াও স্থানীয়ভাবে বিএনপি নেতাকর্মীরা ত্রাণ বিতরণ, বন্যার্তদের সহায়তায় কাজ করে।

বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণের স্বার্থে সাত দিনের জন্য ঢাকা, সিলেট ও রংপুর বিভাগে জাতীয় পার্টির সব সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড স্থগিত করে পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের এমপি। এক আদেশে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের বন্যা দুর্গতদের পাশে থাকার নির্দেশ প্রদান করেন।

দেশের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ, অভিনেতা-অভিনেত্রী, স্যোশাল মিডিয়া সেলিব্রিটিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সংগঠন ও ব্যক্তিরা। দেশের ভয়াবহ এ বন্যা পরিস্থিতি নাড়া দিয়েছে শোবিজ অঙ্গণে। পাশে দাড়িয়েছেন বন্যার্তদের পাশে। অভিনেতা ডিপজল, অনন্ত জলিল, কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবর, দুই বাংলার নন্দিত অভিনেত্রী জয়া আহসান, চিত্রনায়ক সিয়াম আহমেদ, নায়িকা তানজিন তিশা, মাহিয়া মাহিসহ আরো অনেকেই। তারা নিজেরা সাহায্যের পাশাপাশি সবাইকে সাহায্যের আহ্বান জানিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

বন্যাদুর্গত বিপর্যস্ত মানুষদের জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়ে ফেসবুকে লাইভ করেন তরুণ গায়ক তাশরিফ খান। সেই লাইভ মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। দেশের মানুষের কাছে অনুদান পান ১৬ লাখ টাকা। তারপর তাঁদের লেনদেনের সীমা শেষ হয়ে যায়। কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিল না তাশরিফের দল। পরে গতকাল আবারও মানুষের কাছে সহায়তা চেয়ে ফেসবুক লাইভ করেন এবং মুঠোফোনে আর্থিক লেনদেনের নম্বর দিয়ে দেন। সেই নম্বরগুলোতে গত ২৪ ঘণ্টায় জমা হয়েছে এক কোটি টাকার বেশি।

এছাড়াও বানভাসিদের সহযোগিতার জন্য তিন দিনে দেড় কোটি টাকা সংগ্রহ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহ্বানের পর দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন মাধ্যমে তার কাছে এই অর্থ পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, ফেসবুকে বন্যার্তদের জন্য সাহায্যের আবেদন জানানোর পর প্রথম দিনে ৭০ লাখ, দ্বিতীয় দিনে ২৭ লাখ ও আজ তৃতীয় দিন এখন পর্যন্ত ৫৩ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। সবমিলিয়ে দেড় কোটি টাকার কিছু বেশি সংগ্রহ হয়েছে। বাংলাদেশ এটা একটা নজির স্থাপন হয়েছে। আমার মতো একজন মানুষকে সবাই এত বিশ্বাস করেছে সত্যিই আমি অভিভূত।

আরও অনেকে স্যোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে বন্যার্তদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন। এছাড়াও ব্যক্তি, রাজনৈতিক, সাংগঠনিক উদ্যোগেও বন্যার্তদের সাহায্য অব্যাহত রয়েছে।

ক্ষয়ক্ষতি:
বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সড়ক, কৃষি ও মাছের। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবাদিপশু ও গ্রামঢু অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। এছাড়াও নদী ভাঙ্গনের ফলে ফসলি জমি, স্কুল-কলেজ, বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

জাতিসংঘের বন্যা পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের আকস্মিক বন্যায় সুনামগঞ্জের ৯৪ শতাংশ এবং সিলেটের ৮৪ শতাংশের বেশি জায়গা প্লাবিত হয়েছে। এতে আনুমানিক ৪৩ লাখ মানুষ সরাসরি ক্ষত্রিগ্রস্ত হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ কৃষি মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্যে বলা হয়েছে, চলমান বন্যায় এখন পর্যন্ত ৫৬ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বন্যার পানিতে আনুমানিক ১০ হাজার হেক্টর জমির শাকসবজি, তেল বীজ এবং অন্যান্য ফসল প্লাবিত হয়েছে।

অন্যদিকে মৎস্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলমান বন্যায় দেশের পাঁচ বিভাগের ১৫টি জেলার ও ৯৩টি উপজেলার ৬৭ হাজার ৬১০টি মৎস্য খামারের মাছ ভেসে গেছে। যার পরিমাণ ১৬ হাজার ৫৮২ মেট্রিক টন। এতে খামারিদের ক্ষতি হয়েছে ১৬০ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এছাড়াও অবকাঠামো গত ক্ষতি হয়েছে ৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

সিলেটে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি:
সিলেটে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সড়ক, কৃষি ও মাছের। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবাদিপশু ও গ্রামঢু অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১১০০ কোটি টাকার মতো। তবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। গত ১১ মে থেকে সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এখন পানি কমে এলেও সিলেটের বিভিন্ন উপজেলার অনেকাংশ এখনও প্লাবিত অবস্থায় রয়েছে। পানি কমতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে শুরু করে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। সিলেট জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, বন্যায় নগরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। আর সিটি করপোরেশনের হিসাবে নগরে ক্ষতির পরিমাণ শত কোটি টাকা।

লাগাতার বৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলের কারণে সিলেটের বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। সুরমা নদীর পানি বিপদ সীমার উপরে থাকায় পানি প্রবেশ করে নগরীতে। (১৬ জুন ২০২২ইং)

লাগাতার বৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলের কারণে সিলেটের বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। সুরমা নদীর পানি বিপদ সীমার উপরে থাকায় পানি প্রবেশ করে নগরীতে। (১৬ জুন ২০২২ইং)

সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রাথমিক হিসাব করে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে জমা দিয়েছে। জেলা প্রশাসনে জমা দেয়া এসব তথ্য থেকে ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রাথমিক চিত্র পাওয়া যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেয়া হিসাবে, জেলায় বন্যায় ১ হাজার ৭০৪ হেক্টর জমির বোরো, ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমির আউশের বীজতলা ও ১ হাজার ৪৭১ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৪০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেটের উপপরিচালক মো. কাজী মজিবর রহমান।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে সিলেটে নদীরক্ষা বাঁধ রয়েছে ৫২টি। এর দৈর্ঘ্য ১৫ হাজার ৯০০ মিটার। বন্যায় ৩৮টি বাঁধের ২৮ দশমিক ৬০ মিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেঙে যাওয়া বাঁধ সংস্কারের পাশপাশি সবগুলো বাঁধ উঁচু করার সুপারিশ করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসিফ আহমদ।

বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সড়কের। সিলেট নগর ও জেলার ১৩টি উপজেলার সড়ক ও রাস্তা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এ খাতে প্রায় ৪০৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) ৭২ কিলোমিটার সড়ক ভেঙে গেছে। সওজ সিলেট কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মুস্তাফিজুর রহমান জানান, ভেঙে যাওয়া সড়কগুলো জরুরি মেরামতের জন্য ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা প্রয়োজন। আর স্থায়ী মেরামতের জন্য প্রয়োজন ৭৫ কোটি টাকা।

সিলেটের কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায় ত্রাণ সংগ্রহের জন্য নৌকা নিয়ে এদিক-সেদিক ছুটছে পানিবন্দি মানুষ। গত ২৩ জনু তোলা ছবি।

সিলেটের কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায় ত্রাণ সংগ্রহের জন্য নৌকা নিয়ে এদিক-সেদিক ছুটছে পানিবন্দি মানুষ। গত ২৩ জনু তোলা ছবি।

এদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের সংখ্যা ১২০টি। বন্যায় এসব সড়কের প্রায় ২৭৮ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৮টি। টাকার অঙ্কে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২৪৮ কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন এলজিইডির কর্মকর্তারা।

বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সিলেটের মৎস্য খাতও। জেলা মৎস্য অফিসের হিসাবে, পানিতে ১৮ হাজার ৭৪৯টি পুকুর, দিঘি, খামারের মাছ ভেসে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যজীবীর সংখ্যা ১৫ হাজার ১৬৩। ভেসে গেছে ২ হাজার ৩০৫ টন মাছ, ২ দশমিক ১৩ টন পোনা। এ ছাড়া খামারের অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকার। সব মিলিয়ে বন্যায় এখানে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২২ কোটি টাকা। এ ছাড়া গবাদিপশু, খড়-ঘাসসহ এ খাতে মোট ক্ষতির পরিমাণ ১ কোটি ৩৭ লাখ ৯৩ হাজার ১৭০ টাকা।

সুনামগঞ্জ:
সুনামগঞ্জে বন্যায় কৃষি ও যোগাযোগ খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় প্রায় শত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। জেলার ৯০ ভাগ এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ২২শ’ কিলোমিটার সড়ক। এর মধ্যে সড়ক ও জনপথের ১৮৪ কিলোমিটার এবং বাকি দুই হাজার কিলোমিটার এলজিইডির আওতাধীন বলে জানিয়েছে কতৃপক্ষ। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবাদিপশু ও গ্রামঢু অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় পানি কমতে থাকায় দৃশ্যমান হচ্ছে বন্যার বিভিন্ন ক্ষয়ক্ষতির চিত্র।

সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সহায়-সম্বলহীন মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। বানের পানি নামতে শুরু করলেও আশ্রয় কেন্দ্র থেকে সবাই এখনও বাড়িঘরে ফিরতে পারেনি। যারা ফিরতে শুরু করেছেন, তাদের যুদ্ধ শুরু হয়েছে নতুন করে সংসার গোছানোর।

বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকটে পড়েন সুনামগঞ্জের সড়কে আশ্রয় নেয়া বন্যার্তরা। ত্রাণের ট্রাক দেখলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন বন্যা কবলিত মানুষ। (২০ জুন ২০২২ইং)

বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকটে পড়েন সুনামগঞ্জের সড়কে আশ্রয় নেয়া বন্যার্তরা। ত্রাণের ট্রাক দেখলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন বন্যা কবলিত মানুষ। (২০ জুন ২০২২ইং)

সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল তুহিন বলেন, “বন্যার পানি কমলেও সুনামগঞ্জ জেলা শহরের অর্ধেক এলাকার রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ি এখনও নিমজ্জিত। নদী তীরবর্তী এলাকা থেকে পানি নামলেও হাওরের তীরবর্তী এলাকাগুলো থেকে বিলম্বে পানি নামছে। ফলে মানুষের দুর্ভোগ শেষ হচ্ছে না।”

তিনি আরও বলেন, “বন্যায় মানুষের ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু এই ক্ষতির কথা বাদ দিয়ে মানুষ এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম শুরু করেছে। এই ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সরকারি-বেসরকারি সহায়তা প্রয়োজন।”

বন্যায় সুনামগঞ্জে একতলা বিশিষ্ট, টিনসেড ও কাঁচাঘরের বাসিন্দাদের সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখন পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে তারা বাড়িতে ফিরে দেখছেন সব কিছু বানের জলে ভেসে গেছে। বিছানা, বালিশ, কাপড়, মূল্যবান কাগজপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। বন্যা পরবর্তী ভয়াবহ দুর্যোগ সামনে আসছে বলে মনে করছেন অনেকে।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “জেলার ১১ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এ পর্যন্ত ৪ ফুটের বেশি পানি কমছে। তবে মানুষ এখনো আশ্রয় কেন্দ্রে আছেন। যাদের বাড়িঘর বন্যায় বিধ্বস্ত হয়েছে তাদের বসতঘর স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আশ্রয় কেন্দ্রে থেকে সবধরনের সহযোগিতা পাবেন।

হবিগঞ্জ:
এবারের বন্যায় উজান-ভাটি দুদিক থেকেই চাপে পড়ে হবিগঞ্জ। সিলেট ও সুনাগঞ্জের বন্যার পানি কালনি-কুশিয়ারা দিয়ে নামছে হবিগঞ্জে। অন্যদিকে জেলার ভাটি এলাকা দিয়ে প্রবাহিত মেঘনা নদীর পানি বেড়ে চলায় প্লাবিত হতে থাকে নতুন নতুন এলাকা। ফলে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত ৭ লাখ মানুষ।

এতে দুর্ভোগের অন্ত নেই বানভাসি মানুষের। শুরুতে বাড়তে থাকে কালনী, কুশিয়ারা, খোয়াইসহ বিভিন্ন নদীর পানি। কুশিয়ারা নদীর পানি প্রবল বেগে নবীগঞ্জ ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলা দিয়ে প্রবেশ করে। বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই প্লাবিত হয় বিস্তর্ঢু এলাকা। ক্রমেই পানি বাড়তে থাকায় আক্রান্ত হয় বানিয়াচং ও লাখাই উপজেলাও। প্লাবিত হতে থাকে বাহুবল উপজেলাও।

প্রতিদিনই বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে খাদ্য সহায়তা দিয়ে চলেছেন জেলা প্রশাসকসহ কর্মকর্তারা। মাঠে আছেন জনপ্রতিনিধিরাও। জেলা প্রশাসন বলছে, বানভাসিদের উদ্ধার তৎপরতা চলছে। সেই সঙ্গে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। বন্যাদুর্গতদের জন্য জেলায় ৯৩টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এদিকে বন্যার কারণে উপজেলার কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হন। রাস্তাঘাট, হাটবাজার পানিতে তলিয়ে গেছে। বাজারের দোকানপাট ডুবে গেছে।

মৌলভীবাজার:
মৌলভীবাজারে বৃষ্টিপাত কমে আসায় নদ-নদীর পানি কিছুটা হ্রাস পেলেও হাওড়াঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় এ জেলার সাত উপজেলায় প্রায় আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পরে। হাওড়ের পানিতে বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার একাধিক সড়ক পানিতে নিমজ্জিত হয়। ফলে সড়ক যোগাযোগ ব্যহত হয়। বন্যার কারণে দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট দেখা দেয়। একই সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে ডায়রিয়াসহ নানা পানিবাহিত রোগব্যাধি।

ময়মনসিংহ:
অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নেতাই নদীর বাঁধ ভেঙে ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী ধোবাউড়া উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের বিস্তর্ঢু এলাকা প্লাবিত হয়। পানির তোড়ে ভেসে যায় বাড়ি-ঘর। পানিবন্দি হয়ে পড়েন শতশত মানুষ। এতে নিজেরা খাদ্যসংকটে পড়ার পাশাপাশি গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে পড়েন তারা। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ঘোষগাঁও ইউনিয়নে নির্মাণাধীন বেড়িবাঁধ ও নেতাই নদীর পাড় ভেঙে উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া, ঘোষগাঁও ও পুরাকান্দুলিয়া ইউনিয়নের নোয়াপাড়া, কড়ইগড়া, কালিকাবাড়ি, বল্লভপুর, খাগগড়া গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করে। এতে এসব গ্রামের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে অন্য গ্রামগুলোতেও পানি প্রবেশ করে।

শেরপুর:
শেরপুরে ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে শেরপুরের ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ি ও শ্রীবরদী উপজেলার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়ে এলাকার ৫০ হাজার মানুষ। গবাদি পশু, শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে বিপাকে পড়ে প্লাবিত এলাকার মানুষ। নদীর বাঁধ ভেঙে ভেসে গেছে ঘর, আসবাবপত্র, মুরগির খামার। উজানের পানি এখন নীচু এলাকায় নামতে শুরু করায় নতুন করে বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়। দুর্গতদের সহায়তায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৬০ মে. টন চাল, ৩ লাখ টাকা ও পনেরশো প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়। এছাড়াও আরও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।

নেত্রকোনা:
নেত্রকোনার ১০ উপজেলায় বন্যার পানি কিছুটা কমলেও দুর্ভোগে পড়েছেন বানভাসী মানুষেরা। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষজন এখনও বাড়ি ফেরা শুরু করতে পারেনি। জেলা প্রশাসনের হিসাবে ৮২ হাজার ২২০টি পরিবার পানিবন্দী হয়। ১ লাখ ১২ হাজার ৬০৬ জন মানুষ ৩৬০টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেন। বন্ধু করে দেওয়া হয় বন্যা দুর্গত এলাকার স্কুল-কলেজ।

জামালপুর:
জামালপুরে বন্যায় সাতটি উপজেলায় পানিবন্দী হয়ে পড়েন জেলার ২৯টি ইউনিয়নের ১৫৫টি গ্রামের অন্তত ৭০ হাজার মানুষ। দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার এবং গো-খাদ্যের সংকট দেখা দেয়। বন্যার পানি প্রবেশ করায় পাঠদান বন্ধ হয়েছে দুই শতাধিক মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বন্যায় ডুবে গেছে নিম্মাঞ্চলের অন্তত ৫ হাজার হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল ও ৮৫টি পুকুর। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে এ পর্যন্ত সরকারিভাবে জেলায় ৪৭০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।

পানি কমায় জামালপুরে প্রায় ১০টি স্থানে চলছে তীব্র নদী ভাঙন। দেওয়ানগঞ্জে চর আমখাওয়া ইউনিয়নের লম্বাপাড়া, বকশীগঞ্জের কুশলনগর, সাজিমারা, বাঙ্গালপাড়া, কতুবেরচর, ইসলামপুর উপজেলার মডেল চর ইউনিয়ন সাপধরী, পলবান্ধা ইউনিয়নের নতুনপাড়া ও গোয়ালেরচর ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর গ্রামে নদী ভাঙন শুরু হয়।

কুড়িগ্রাম:
কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন বন্যা কবলিত এলাকার দুই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী। বন্যায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায়, ত্রাণ-সংকটে পড়েছেন পানিবন্দী মানুষ। বন্যার কারণে খাদ্য, বিশুদ্ধ খাবার পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের অভাব, বন্যার্তদের দুর্ভোগ তীব্র রুপ ধারণ করেছে। বন্যার কারণে জেলার ২৯৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ থাকায়, ৬৫ হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া, বন্যার কারণে ২৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সাতটি মাদরাসা ও একটি কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

কুড়িগ্রাম জনস্বাস্থ্য ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন-অর-রশিদ জানান, “বন্যা কবলিত এলাকায় টিউবওয়েল স্থাপন ও পুরাতনগুলো মেরামতের পাশাপাশি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ ও অস্থায়ী টয়লেট স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবদুর রশিদ জানান, “বন্যার পানিতে ১৫ হাজার ৮৫২ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। তলিয়ে যাওয়া ফসলের মধ্যে রয়েছে পাট, ধান ও সবজি।”

বন্যা কবলিত এলাকায় সড়ক যোগাযোগ এখনও বন্ধ রয়েছে। সদর উপজেলার ঝুংকার চর কমিউনিটি ক্লিনিকের, কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার মিজানুর রহমান বলেন, “মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা বা ভেলায় করে চিকিৎসা কেন্দ্রে আসছে।”

কুড়িগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মঞ্জুর এ মোর্শেদ বলেন, “দুটি ক্লিনিক বন্ধ এবং ১৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও, এই ১৮টি ক্লিনিকের কর্মীরা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।”

রৌমারী উপজেলায় বন্যার পানি প্রবেশ করায় রৌমারী উপজেলার ৩৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়। টানা পাঁচদিন ধরে বন্যার পানিতে তলিয়ে থাকায় এসব এলাকার প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির আউশ ধান, পাট, বাদামসহ বিভিন্ন সবজিক্ষেত নষ্ট হওয়ার উপক্রম।

লালমনিরহাট:
জুনের শেষের দিকে নদ-নদীর পানি কমায় কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলার বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হয়। রাস্তা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া বানভাসিরা বাড়ি ফিরতে শুরু করেন। তবে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র ও ধরলাপাড়ে বিভিন্ন বন্যা উপদ্রুত এলাকায় এখনো বন্যার পানি রয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেসব এলাকা থেকে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার আশা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। বন্যার পানি নামতে শুরু করায় ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও গঙ্গাধরের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি, ফলের বাগান ও নানা স্থাপনা।

কিশোরগঞ্জ:
কিশোরগঞ্জ জেলার ১১ উপজেলার ৬৫টি ইউনিয়নের এক লাখ ২০ হাজার দুর্গত মানুষ দুুর্ভোগে পড়েন। তাছাড়া ১১ উপজেলায় প্রায় সাড়ে ১২ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়। এরমধ্যে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৯৮ জন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ খাদ্য ও বাসস্থানের সমস্যায় আছেন। ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের প্রকোট বাড়তে থাকে। দুর্গত মানুষেরা ত্রাণের আশায় ছুটে বেড়াচ্ছেন। নিম্নআয়ের লোকজন দিশেহারা। এ অবস্থায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ স্বেচ্ছসেবী সংগঠনগুলো ত্রাণ তৎপরতা বাড়ায়। এবারের বন্যায় সারা জেলায় কয়েক শ’ মাছের খামার পানিতে মাছ ভেসে যাওয়ায় প্রায় ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে খামারিরা দাবি করেন। ভয়াবহ বন্যার কারণে কিশোরগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত ১৯৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকার বেশিরভাগ রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। পানি উঠেছে বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে।

কিশোরগঞ্জে হাওরের নিকলী, অষ্টগ্রাম, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও বাজিপুরের প্রায় শতাধিক গ্রাম বন্যার পানি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে ভাঙনের কবলে পড়ে। ২৩ জুন বন্যা ও ভাঙনের পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। ছাতিরচর, সিংপুর, দামপাড়া ইউনিয়ন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বন্যার কারণে বিভিন্ন এলাকায় ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এছাড়া বন্যার্তদের মধ্যে পানিবাহিত নানা রোগ দেখা দিয়েছে। তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। বন্যার কারণে হাওরে ইউনিয়নে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম আক্রান্তদের সেবা নিশ্চিত করছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও প্রবল বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় কিশোরগঞ্জে স্বাস্থ্যসেবায় ১৬৮ সদস্যের মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে।

বন্যাদুর্গত এলাকায় মূল্যবৃদ্ধি!
বন্যার ভয়াবহতা শুরু পর সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট উপজেলার বন্যাকবলিত মানুষের স্বজনেরা ভিড় করতে থাকেন সিলেট শহরের পার্শ্ববর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলার সালুটিকর ঘাটে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এই ঘাটে শতাধিক যাত্রীবাহী নৌকা ছাড়াও বালুবাহী নৌকাও বন্যাদুর্গতদের সরিয়ে আনার জন্য কাজ করছে। কিন্তু নৌকার মালিক ও মাঝিরা সব নৌকার ভাড়া অন্তত শতগুণ বাড়িয়ে দেয়। সালুটিকর থেকে কোম্পানীগঞ্জের তেলিখাল গ্রামের দূরত্ব ১০ কিলোমিটার। স্বাভাবিক সময়ে এই পথটুকু নৌকায় যেতে ৮শ’ থেকে ১ হাজার টাকা খরচ হয়। বন্যার সময় এই ১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে মাঝিরা ভাড়া হাঁকেন ৫০ হাজার টাকা। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে গ্রামের বাড়ি থেকে সিলেট শহরে নিয়ে আসতে গিয়ে এমন অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন মারুফ আহমেদ নামে এক ব্যক্তি। তিনি ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে রাজি হলেও নৌকার মাঝি রাজি হননি। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

এছাড়াও বন্যাদুর্গত এলাকাগুলেঅতে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্য সামগ্রীর কৃত্রিম সংকট তৈরির খবর পাওয়া যায়। বন্যার্তদের অসহায়ত্বের সুযোগে বন্যাক্রান্ত মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দিগুণ মূল্য হাতিয়ে নেন ব্যবসায়ীরা। ফলে পানিবন্দি মানুষের দূর্ভোগ আরো বৃদ্ধি পায়। বন্যার কারণের অসহায় মানুষের কাজ নেই। নেই কোন উপার্জন। এমন অবস্থায় খাদ্য সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি যেন মরার উপর খারার ঘা হয়ে দাঁড়ায়। ২৫ টাকা দামের মোমবাতি ৮০ থেকে ১শ টাকা প্যাকেট বিক্রি, চিড়া ৯০ টাকা কেজি, মুড়ি ১শ-১১০টাকা, কেরোসিন ১শ থেকে ১৩০টাকা, দিয়াশলাই ডজন ৩০ টাকা বিক্রির মতো ঘটনাও ঘটে। ৫০ কেজির চালের বস্তার দামও ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে বেশি নেওয়া শুরু হয়। এছাড়াও গ্যাস সিলিন্ডার, পেঁয়াজ, আলুসহ বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রীর দামও বৃদ্ধি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা।

মৃত্যু:
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য মতে ১৭ জুন থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত বন্যাকবলিত এলাকায় মৃত্যু হয়েছে ৮৪ জনের। বন্যায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে সিলেট বিভাগে। এই বিভাগে এ পর্যন্ত ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে সুনামগঞ্জ জেলায়। এই জেলায় এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরপর বেশি মৃত্যু হয়েছে সিলেট জেলায়। জেলাটিতে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিভাগের হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলায় মারা গেছে যথাক্রমে ৪ ও ৪ জন।

সিলেট বিভাগের পর বন্যায় বেশি মৃত্যু হয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগে। এই বিভাগে মারা গেছে ২৮ জন। এই বিভাগের ময়মনসিংহে ৫, নেত্রকোনায় ৯, জামালপুরে ৯ ও শেরপুরে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও রংপুর বিভাগে এখন পর্যন্ত বন্যায় ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কুড়িগ্রামে ৩ ও লালমনিরহাটে একজন মারা গেছেন।

বন্যা উপদ্রুত এলাকায় বেশি মৃত্যু ঘটে পানিতে ডুবে। এ পর্যন্ত ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে পানিতে ডুবে। আর বজ্রপাতে মারা গেছে ১৪ জন।

তথ্যসূত্র: প্রথমআলো, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, বাংলানিউজ টুয়েন্টিফোর, জাগোনিউজ টুয়েন্টিফোর, রাইজিংবিডি, ইত্তেফাক অনলাইন, বাংলাট্রিবিউন।

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.