Tech Express
techexpress.com.bd

যেকারণে ইনটেল চিপ থেকে সরে আসছে অ্যাপল

নিউজ ডেস্ক:
শিরোনামটি অনুসরণ করে এই আর্টিকলটি শুরু হতে পারতো অনেকটা এভাবে- “যে যে কারণে অ্যাপল তাদের কম্পিউটারে ইনটেল প্রসেসর ব্যবহার বন্ধ করে দিচ্ছে তাহা নিম্নরূপ”- এরপর আমরা এক দুই তিন করে বেশ কয়েকটি পয়েন্ট বলে যেতে পারতাম।

সেভাবে বলা যেতেই পারে, তবে তার আগে চলুন আমরা ফিরে যাই ২০০৫ সালে। যেখান থেকে অ্যাপল কম্পিউটারের সঙ্গে ইনটেল প্রসেসরের ‘দাম্পত্য জীবন’ শুরু।

অ্যাপল প্রতিবছর কয়েকটি নিয়মিত আয়োজন করে থাকে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়োজন হলো ডাব্লিউডাব্লিউডিসি বা ওয়ার্ল্ডওয়াইড ডেভেলপার্স কনফরেন্স। এই আয়োজনটিতে অ্যাপল সাধারণত সফটওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশনের ঘোষণা দিয়ে থাকে।

তবে মাঝে মধ্যে হার্ডওয়্যারের ঘোষণাও যে এখান থেকে আসে না তা নয়। ২০০৫ সালের ডাব্লিউডাব্লিউডিসিতে সে সময়ের অ্যাপল সিইও স্টিভ জবস এমন একটি হার্ডওয়্যার ঘোষণা দেন যেটি সফটওয়্যারের বেলায় অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ ছিল- অ্যাপল ভবিষ্যতের কম্পিউটারের জন্য নিজস্ব ‘পাওয়ারপিসি’ প্রসেসর থেকে ইনটেল প্রসেসরে চলে যাচ্ছে।

দেড় দশক আগের ওই ঘটনা আজ মনে করার কারণ হলো- সে সময় স্টিভ জবস ইনটেল প্রসেসরে চলে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কারণ দেখিয়েছিলেন, আজ সেই কারণটিই ইনটেল থেকে সরে আসার পেছনে কাজ করেছে। আসুন দেখে নেই সেটিসহ অন্য বিষয়গুলো-

পারফর্মেন্স পার ওয়াট : একটি প্রসেসরের কার্যক্ষমতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ তবে তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ওই কার্যক্ষমতা কত কম বিদ্যুৎ খরচে পাওয়া সম্ভব- এমনটাই বলেছিলেন স্টিভ জবস ২০০৫ সালে। ম্যাক কম্পিউটারে ইনটেল প্রসেসর ব্যবহারের পেছনে সে সময় সবচেয়ে বড় যুক্তি ছিল এটাই। স্টিভ জবসের ভাষায় এটা “নট ওনলি পারফর্মেন্স বাট পারফর্মেন্স পার ওয়াট”।

সে সময়ে ওয়াট প্রতি কার্যক্ষমতার প্রশ্নে পাওয়ারপিসি প্রসেসরের তুলনায় ইনটেল এগিয়ে ছিল, ফলে অ্যাপল নিজের প্রসেসর বাদ দিয়ে ইনটেল প্রসেসরে চলে যায়। “আমরা আপনাদের জন্য অসম্ভব ভালো পণ্যের আইডিয়া নিয়ে বসে আছি কিন্তু পাওয়ার পিসি প্রসেসরের কাঠামো ব্যবহার করে এগুলো বানানো সম্ভব নয়।” – সে সময় বলেছিলেন অ্যাপল সহপ্রতিষ্ঠাতা।

আজ দেড় দশক পরে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। ২০২০ সালে এসে অ্যাপল যে ধরনের, যে কার্যক্ষমতার কম্পিউটার তৈরির পরিকল্পনা করছে সেগুলি প্রচলিত ইনটেল প্রসেসর ব্যবহারে তৈরি সম্ভব নয় বলেই দাবি প্রতিষ্ঠানটির।

মঙ্গলবারের আয়োজনেও সেই সুর মিললো অ্যাপলের উপস্থাপনায়। অ্যাপল বলছে প্রচলিত ইনটেল কোয়াড কোরের বদলে অ্যাপল অক্টাকোর প্রসেসর ব্যবহার করবে ম্যাক কম্পিউটারে যার কার্যক্ষমতা হবে ইনটেলের তুলনায় প্রায় সাড়ে তিন গুণ!

তারহীন যুগে ব্যাটারি লাইফ এবং ফর্মফ্যাক্টর : ‘ইনটেল ইনসাইড’ স্লোগানটি মনে পড়ে? ওই স্লোগানের সঙ্গে সম্ভবত সবারই চোখে ভাসে টেবিলের ওপর রাখা পিসির সিপিউ। হ্যাঁ, ইনটেলের ইমেজের সঙ্গে ডেস্কটপ পিসি কল্পনা করা যতোটা সহজ ততোটা মোইবাইল ডিভাইস নয়।

মোবাইল ডিভাইসের জন্য প্রসেসর তৈরির বেলায় দুটি বিষয় অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ। এক. প্রসেসরের মধ্যে বিভিন্ন ইউনিট জুড়ে দেওয়ার ক্ষমতা এবং এর পেছনে শক্তি খরচ। একই চিপে বিভিন্ন উপাদান যেমন জিপিইউ, ওয়াইফাই, ইমেজ প্রসেসর জুড়ে দেওয়া হয় এবং এর ফলে প্রসেসরের নতুন একটি শ্রেণি তৈরি হয় যার নাম হয়ে ওঠে এসওসি বা সিস্টেম-অন-এ-চিপ।

ইনটেল সিস্টেম-অন-এ-চিপ প্রসেসর তৈরিও করেছে- অ্যাটম প্রসেসর (নেটবুকে বহুল ব্যবহৃত অ্যাটম প্রসেসর নয়)। কিন্তু সেই প্রসেসর তাল মেলাতে পারেনি এআরএমভিত্তিক অন্যান্য সিস্টেম-অন-এ-চিপ প্রসেসরের সঙ্গে।

২০১৩ সালেই যখন এআরএমভিত্তিক সিস্টেম-অন-এ-চিপ প্রসেসরে টাচ কন্ট্রোলার, ওয়্যারলেস মডেম একই চিপে আনা সম্ভব হয়েছে, তখনও ইনটেল চিপ ব্যবহার করলে ওইসব কাজের জন্য আলাদা প্রসেসরের দরকার পড়েছে।

ফলে মোবাইল ডিভাইসের আকার ছোট করে আনা বা প্রসেসরের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যটারির আকারের প্রশ্নে পেছনে পড়ে যায় ইনটেল প্রসেসর। এদিকে যতো দিন যাচ্ছে ততোই মানুষের কাজের ধরন হয়ে উঠছে মোবাইল ডিভাইস নির্ভর। ফলে ব্যাটারি লাইফ এবং পণ্যের আকার ছোট রাখার সামর্থ হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে অ্যাপল বছরের পর বছর ধরে নিজেদের আইফোন এবং আইপ্যাডের জন্য সিস্টেম-অন-এ-চিপ প্রসেসর তৈরি করে আসছে যেটিকে অ্যাপল বলছে ‘এ সিরিজ’ চিপ। এতোদিন ধরে এ সিরিজ চিপ তৈরির অভিজ্ঞতা অ্যাপল এখন কাজে লাগাচ্ছে এম সিরিজের পেছনে। সেই ফলাফল দেখা গেল মঙ্গলবার অ্যাপলের উপস্থাপনায় এম সিরিজ চিপ বর্ণনার একটি স্লাইডে। দেখে নিন আট কোর সিপিইউ-এর পাশাপাশি আর কোন সব স্বক্ষমতার সন্নিবেশ ঘটিয়েছে অ্যাপল।

অ্যাপল ইকোসিস্টেম : মঙ্গলবারের ঘোষণায় অ্যাপল অনেকটা চুপিসারেই একটি বিষয় উল্লেখ করেছে, যেটি পরে অ্যাপল ওয়েবসাইটেও উঠে এসেছে- এই প্রথমবারের মতো এআরএমনির্ভর এম সিরিজ প্রসেসরের কারণে আইফোন এবং আইপ্যাডের অ্যাপ এখন কোনোরকম আলাদা সংস্করণ তৈরি ছাড়াই সরাসরি ম্যাক কম্পিউটারে চালানো যাবে। এর মাধ্যমে অ্যাপল যে প্ল্যাটফর্ম ইকোসিস্টেমের জন্য অনেক আগে থেকেই পরিচিত, সেই চুড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর শেষ ধাপে সম্ভবত পৌঁছে গেল প্রতিষ্ঠানটি। আইফোন, আইপ্যাডের আইওএস এবং ম্যাক ওএস একই প্ল্যাটফর্মে চালানোর স্বক্ষমতা এখন পাচ্ছে অ্যাপল যেটি একাধিক ধরনের প্রসেসরে সম্ভব নয়।

আইওএস ল্যাপটপ? “ আগের পয়েন্টেরই বাড়তি ধাপ এটি। এআরএমর্নির্ভর প্রসেসর হওয়ার কারণে ভবিষ্যতে আইওএস চালিত ল্যাটপও বাজারে চলে আসা অসম্ভব নয়। প্রযুক্তি সম্মেলন ‘অল থিংস ডিজিটাল’ এর উদ্যোক্তা ওয়াল্ট মসবার্গ তো এ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেই বসেছেন অ্যাপলের নিজস্ব প্রসেসরে ফেরত যাওয়ার ঘোষণায়। আইওএস চালিত ল্যাপটপ বাজরে এলে একটি কিনে ফেলবেন বলেও জানিয়ে রেখেছেন ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পত্রিকার এই প্রযুক্তি সম্পাদক।

প্রযুক্তির বসন্তকাল : ফেরত যাই আবার স্টিভ জবসে। প্রযুক্তি গ্রহন বা বর্জনের বেলায় অ্যাপল একেবারে শূন্য আবেগে সিদ্ধান্ত নেয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই অ্যাপল তাদের কম্পিউটার থেকে বাদ দিয়েছিল ফ্লপি ড্রাইভ যে বিষয়টিকে অনেকেই তখন ভেবেছিলেন অকল্পনীয়। ম্যাকবুক এয়ার থেকে পরে প্রতিষ্ঠানটি ফেলে দেয় অপটিক্যাল ড্রাইভ বা সিডি/ডিভিডি রম।

এ বিষয়ে অল থিংস ডিজিটাল কনফারেন্সে জবস বলেছিলেন, “প্রতিটি প্রযুক্তিরই উত্থানপর্ব বা বসন্তকাল আছে, যখন বিশেষ কোনো প্রযুক্তি বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে বিকশিত হতে থাকে। একপর্যায়ে এটি মধ্যগগণে পৌঁছায় এবং সর্বশেষে এটি তার শীতকালে পৌঁছায় এবং প্রযুক্তির মৃত্যু হয়।”

“আমরা অ্যাপলে খুব সতর্কতার সঙ্গে বেছে নেই মাঠে ছুটতে হলে কোন (প্রযুক্তি) ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হবো।”

প্রযুক্তি বাজারে ট্রেন্ডসেটার অ্যাপলের হাত ধরেই ফ্লপি ডিস্ক, অপটিক্যাল ড্রাইভ আর অ্যাডোবি ফ্ল্যাশ প্রযুক্তির জীবনাবসানের বার্তা এসেছিল। ম্যাকবুক প্রো, যে ল্যাপটপ সিরিজকে স্টিভ জবস বেঞ্চমার্ক পণ্য হিসেবে বিবেচনা করতেন, সেখান থেকে ইনটেল প্রসেসর বাদ দেওয়ার মানে কী অ্যাপল মনে করছে যে, এক্স৮৬ প্ল্যাটফর্মের মৃত্যুঘণ্টা ঘনিয়ে এসেছে? এর জবাব পাওয়ার জন্য কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে আমাদের।

Leave A Reply

Your email address will not be published.